১৫ সেপ্টেম্বর থেকে চীনে নতুন এক্সিট-এনট্রি বিধিমালা: ভুয়া তথ্য, নথি ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর বাড়ছে নজরদারি
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে চীনে প্রবেশ ও বহির্গমন প্রশাসনসংক্রান্ত নতুন বিধিমালা কার্যকর হয়েছে। নতুন এই বিধিমালায় ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত আবেদন, প্রবেশ ও বহির্গমন প্রক্রিয়া, মিথ্যা তথ্য বা নথির ব্যবহার, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত মধ্যস্থতাকারী সেবার ওপর আরও সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
১৯ ধারাবিশিষ্ট “রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রবেশ ও বহির্গমন প্রশাসন প্রবিধান” (State Council Regulation on Exit and Entry Administration) গত ২৯ জুন রাষ্ট্রীয় পরিষদের নির্বাহী বৈঠকে অনুমোদিত হয়। পরে ২২ জুলাই চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং (Li Qiang) এতে স্বাক্ষর করেন এবং ৩১ জুলাই প্রবিধানটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চীনে প্রবেশ, চীন থেকে বহির্গমন কিংবা দেশটিতে অবস্থান বা বসবাসের জন্য দাখিল করা আবেদনের উদ্দেশ্য অবশ্যই সত্য ও আইনসম্মত হতে হবে। অভিবাসন ও ভিসা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদনকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে এবং পরিচয়, ভ্রমণের উদ্দেশ্য বা আবেদনে দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথি, উপকরণ ও ইলেকট্রনিক ডেটা উপস্থাপনের নির্দেশ দিতে পারবে। মিথ্যা তথ্য, বিবৃতি বা নথি ব্যবহার করা হলে ভ্রমণ নথি প্রদান কিংবা চীনে প্রবেশ বা বহির্গমনের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
মিথ্যা তথ্য বা নথি দিলে বিদেশিদের ১–৫ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা হতে পারে:
বিদেশি নাগরিকরা চীনা ভিসার জন্য বিদেশে আবেদন করার সময় কিংবা সীমান্ত চেকপয়েন্টে চীনে প্রবেশের সময় মিথ্যা তথ্য, বিবৃতি বা নথি প্রদান করলে তাদের এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চীনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
এছাড়া সীমান্ত প্রশাসনে বাধা দেওয়াসংক্রান্ত অপরাধে ফৌজদারি শাস্তি পাওয়া ব্যক্তি কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে ভ্রমণ নথি সংগ্রহ বা অবৈধভাবে প্রবেশ-বহির্গমনের কারণে প্রশাসনিক শাস্তি পাওয়া বিদেশির ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হতে পারে। সংশ্লিষ্ট শাস্তি শেষ হওয়ার পর থেকে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ গণনা করা হবে। ভিসা বা অন্যান্য প্রবেশ-বহির্গমন আবেদন প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণপত্র বা সহায়ক নথি প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও ওই নথির সত্যতার দায় নিতে হবে।
মিথ্যা আমন্ত্রণপত্র বা আবেদনসংক্রান্ত নথি সরবরাহকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ ইউয়ান পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অপরাধে জড়িত হলে ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ইউয়ান পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক বা কর্মীদেরও পৃথকভাবে জরিমানা করা যেতে পারে।
নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনা নাগরিকদের বহির্গমনে বিধিনিষেধ:
সশস্ত্র সংঘাত, অপরাধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দেশ বা অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে চীনা কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের জন্য সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে পারবে। অভিবাসন কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতে পারে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত গন্তব্যে কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি হয়েছে এমন স্থানে ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করতে পারবে। তবে কোনো গন্তব্যের বিষয়ে ঝুঁকি সতর্কতা জারি হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই দেশে ভ্রমণ বা চীন ত্যাগ নিষিদ্ধ হবে—এমনটি প্রবিধানে বলা হয়নি।
প্রতারণার মাধ্যমে প্রবেশ বা বহির্গমন নথি সংগ্রহ কিংবা অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ-বহির্গমনের দায়ে প্রশাসনিক আটক শাস্তি পাওয়া চীনা নাগরিকদের শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত চীন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। বিদেশে অবস্থানকালে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে এমন অবৈধ বা ফৌজদারি কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দেশে ফেরার পরও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহির্গমন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা যেতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানি বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে জাতীয় শিল্প বা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চীন ত্যাগে বাধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অভিবাসনসংক্রান্ত মধ্যস্থতাকারীদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক:
নতুন প্রবিধানে অভিবাসন নীতিবিষয়ক পরামর্শ, ভিসা বা অন্যান্য নথির আবেদন এবং প্রবেশ-বহির্গমন প্রক্রিয়ায় সহায়তার মতো সেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর বিধান রাখা হয়েছে। নতুন কোনো অভিবাসন মধ্যস্থতা ব্যবসা চালু হলে প্রতিষ্ঠার ১৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করতে হবে। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রবিধান কার্যকর হওয়ার সময় যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এ ধরনের সেবা দিয়ে আসছে, তাদের ৯০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
প্রবিধান অনুযায়ী মধ্যস্থতাকারীরা মিথ্যা তথ্য প্রচার, অতিরঞ্জিত বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, জাল নথি সরবরাহ, অনুপযুক্ত উপায়ে ভিসা বা পাসপোর্ট পেতে সহায়তা, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস কিংবা সীমান্ত অতিক্রম করে সংঘটিত অবৈধ বা ফৌজদারি কর্মকাণ্ড সংগঠিত করতে পারবে না। নিবন্ধন না করা অথবা নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের নির্দেশ ও জরিমানা করা হতে পারে। গুরুতর বা বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবসা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। কোনো কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়লে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশি শিক্ষার্থী ও বৈধ ভ্রমণকারীদের জন্য কী অর্থ বহন করে:
নতুন প্রবিধান চীনে বৈধভাবে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থী বা সাধারণ বৈধ ভ্রমণকারীদের জন্য কোনো সার্বিক নতুন প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না। বরং ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট এবং অন্যান্য প্রবেশ-বহির্গমনসংক্রান্ত আবেদনে সঠিক তথ্য, সত্য নথি এবং বৈধ উদ্দেশ্য নিশ্চিত করার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনে অধ্যয়নরত বা ভবিষ্যতে চীনে আসতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তাই ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট, আমন্ত্রণপত্র এবং অন্যান্য সরকারি নথি প্রস্তুতের সময় তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অননুমোদিত বা সন্দেহজনক ভিসা ও অভিবাসন মধ্যস্থতাকারীর পরিবর্তে স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য সেবার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নতুন প্রবেশ ও বহির্গমন প্রশাসন প্রবিধানটি ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
Raoha
BCYSA.ORG এর নিউজ-এ আপনিও লিখতে পারেন। গণচীনে প্রবাস জীবনে আপনার অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খবরাখবর, আনন্দ-বেদনার গল্প, স্মৃতিচারণ, ভ্রমণ, অনুভূতি, বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর ছবিসহ আমাদের (বাংলা অথবা ইংরেজিতে) পাঠাতে পারেন। লেখা পাঠানোর ইমেইল : news.bcysa@outlook.com।